আত্মত্যাগী এক বালকের গল্প: আসহাবে উখদুদ ও ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা

যাতায়াতের পথ আগলে থাকা সেই বিশাল জন্তু

যাতায়াতের পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক জন্তু। ব্যস্ততম এই রাস্তায় মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। আতংকে সবাই ছোটাছুটি শুরু করলো। জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। জীবন জীবিকায় ব্যাঘাত ঘটছে। এই বিপদ থেকে মুক্তি মিলবে কীভাবে?

প্রতিদিনের রুটিন মাফিক বালকটি জাদুকরের কাছে যাচ্ছিল। সংকটের এই দৃশ্যটি এখন তার চোখের সামনে। যাওয়ার কোনো পথ খোলা নেই। বালকটি ভাবল, এটা জাদুকরি নাকি সত্য, তা পরীক্ষা করে দেখার এটিই উপযুক্ত সময়।

সে একটি পাথরের টুকরা কুড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘হে আল্লাহ, যদি তাওহীদবাদীর আমল তোমার কাছে জাদুকরের আমলের চেয়ে ভালো এবং পছন্দের হয়, তাহলে এই জন্তুকে মেরে ফেল, যাতে মানুষের যাতায়াতের পথটি খুলে যায়।’ এই বলে বালকটি পাথর ছুড়লে জন্তুটি মারা গেল।

মূর্তিপূজারী বাদশাহ ও জাদুকরের শূন্যতা

এই দেশের বাদশাহ মূর্তিপূজারী ছিল। দেশের সাধারণ মানুষকে মূর্তিপূজায় অভ্যস্ত করে রেখেছিল। সে আল্লাহর একত্ব ও তাওহীদের প্রবল বিরোধী ছিল। তাওহীদবাদীদের উপর নির্যাতন নিপীড়ন চালাতো। তার অত্যাচারের কারণে দেশে টিকে থাকা কঠিন ছিল। যারা ছিল তারা অতি গোপনে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীতে ব্যস্ত থাকতো।

তবে কোনভাবে বাদশাহর কাছে তাদের পরিচয় ফাঁস হয়ে গেলে বিপদ হয়ে যেত। সাথে সাথে সে তার সেনা-পুলিশকে পাঠিয়ে ধরে নিয়ে আসত। অত্যন্ত নিকৃষ্ট উপায়ে, যন্ত্রণা দিয়ে তাদের হত্যা করতো। যাতে কেউ আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস ও ইবাদত করার সাহস না করে। মোটকথা সে রাষ্ট্রের পূর্ণশক্তিকে ব্যবহার করে শিরককে দেশে টিকিয়ে রেখেছিল। আল্লাহর দ্বীন ও তাওহীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। গ্রহণ করেছিল জিরো টলারেন্স নীতি।

পাশাপাশি সে জাদুবিদ্যার ভীষণ ভক্ত ছিল। জাদুকরদের অনেক সুবিধা দিয়ে রেখেছিল। তার দরবারে একজন জাদুকর ছিল। দীর্ঘদিন সে বাদশাহর খেদমতে ছিল। সময়ের পরিক্রমায় সে বার্ধক্যে পৌঁছে গেল।

সে ছিল অনেক অভিজ্ঞ জাদুকর। সে শংকিত হলো, তার মৃত্যুর পর এই জাদু হারিয়ে যাবে। তার জাদুবিদ্যা ধারণকারী আর কেউ নেই। এখন তার এমন কাউকে দরকার, যে খুব মেধাবী হবে, যাতে অতি দ্রুত এই বিদ্যা শিখে নিতে পারে। অল্প বয়স্ক হবে, যাতে দীর্ঘদিন বাদশাহর দরবারে খেদমত করতে পারে।

তখন সে বাদশাহকে তার ভাবনার কথা জানিয়ে বলল, ‘আমাকে একটি বুদ্ধিমান বালক এনে দিন। আমি তাকে এই বিদ্যাটি শিখিয়ে দেব।’

তাওহীদের পথে বালকের প্রথম পদক্ষেপ

বাদশাহ খুশিমনে একটি বুদ্ধিমান বালককে জাদুকরের কাছে তুলে দিলেন। বালকটি প্রতিদিন জাদুকরের কাছে গিয়ে জাদুবিদ্যা শিখতে শুরু করলো।

বালকটির আসা-যাওয়ার পথে একজন তাওহীদবাদী থাকতেন। তিনি গোপনে আল্লাহর ইবাদত করতেন। ঘটনাক্রমে তাঁর সাথে বালকটির পরিচয় হলো। ইবাদতরত অবস্থায় সে তাঁকে দেখতে পেল। সে আগে কখনো এরকম ভাবে কাউকে ইবাদত করতে দেখেনি। তার কাছে এটি খুব ভালো লাগলো। তার কৌতুহল আরো বেড়ে গেল।

জাদুকরের কাছে সে যখন শিখতে যেত, আসা যাওয়ার পথে তাওহীদবাদীর সাথে সময় কাটাতো। সে আল্লাহর এই বান্দার কাছে এসব কিছুর ব্যাখ্যা জানতে চাইলো। তিনিও তাঁর জ্ঞানভাণ্ডার বালকটির সামনে উন্মুক্ত করে দিলেন। আল্লাহর কথা বললেন। প্রজ্ঞার সাথে আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরলেন।

সে যুগের রাসুলের কথা বললেন। আখেরাতের ব্যাপারে সঠিক আকীদার শিক্ষা দিলেন। দ্বীনের বিধানগুলো তুলে ধরলেন। ভালো মন্দের পার্থক্য বুঝালেন। সৎকর্মের আদেশ দিলেন, অসৎকর্ম থেকে নিষেধ করলেন। সে এসব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনত। প্রতিটা কথা অন্তরে ধারণ করে নিল। ঈমানের আলোয় আলোকিত হলো বালকটির অন্তর। সেও হয়ে উঠলো একজন তাওহীদবাদী। উভয়ের মাঝে গড়ে উঠলো এক আত্মীক সম্পর্ক, ঈমানী ভ্রাতৃত্ব।

সত্য ও মিথ্যার মানসিক দ্বন্দ্ব

এর মাঝে একটা সমস্যা দেখা দিলো। আসা-যাওয়ার পথে তাওহীদবাদীর সাথে দেখা করতে গিয়ে জাদুকরের কাছে যেতে ও বাসায় ফিরতে বালকটির প্রায় সময় দেরি হতো। একারণে সে জাদুকরের কাছে গেলে মার খেত। বাসায় ফিরলে বাবার কাছে মার খেত। বিষয়টি ওস্তাদের কাছে খুলে বললে তিনি তাকে একটা বুদ্ধি শিখিয়ে দিলেন। জাদুকরের কাছে গিয়ে বলবে বাসার কাজে দেরি হয়ে গেছে। বাসায় ফিরলে বলবে, জাদুকর ধরে রেখেছিল।

এভাবে সমস্যাটির সমাধান হয়ে গেল। প্রতিদিন বালকটি ঈমানের পথে একটু একটু করে অগ্রসর হচ্ছিল। সে দুটি বিপরীতমুখী শিক্ষা গ্রহণ করছিল। একটি তাওহীদ ও ঈমানী, অপরটি শিরক ও কুফর। একদিকে আল্লাহর আনুগত্য, অপরদিকে অবাধ্যতা।

গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য সে জাদুকরের কাছে যাওয়া থামায়নি। কিন্তু সে এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে থাকতে চায়নি। আল্লাহর অবাধ্যতা মেনে নিতে পারেনি। অর্থহীন বিষয় শিখে সময় নষ্ট করতে চায়নি। তাই সে এমন একটা কিছুর অপেক্ষা করছিল, যা তাকে এই দোদুল্যমান অবস্থা থেকে মুক্তি দিবে। শীঘ্রই তার সামনে সুযোগ এসে গেল। পাথরের আঘাতে জানোয়ারটি মারা যেতেই তার অন্তর প্রশান্তিতে ভরে উঠলো।

বালক এবার তাওহীদবাদীর কাছে এসে সব খুলে বলল। তিনি বললেন, ‘এবার তুমি জ্ঞানের পূর্ণতায় পৌঁছে গেছ। শীঘ্রই তোমার পরীক্ষা শুরু হতে চলেছে। যারাই সত্যের পথে চলবে, তাদেরকে অবশ্যম্ভাবী পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। অতীতেও এমন হয়েছে। এটা আল্লাহর অমোঘ নীতি। তবে উত্তম পরিণতি কেবল মুত্তাকীদের জন্য। সতর্ক থেকো, কোনোভাবেই আমার নাম প্রকাশ করবে না।’

অলৌকিক ক্ষমতা ও ঈমানের দাওয়াত

এদিকে বিশাল জন্তুটি মারা যাওয়ার পর দেশে বালকটির নাম ছড়িয়ে পড়লো। কারণ ঘটনাটা ঘটেছিল বাজারে উপস্থিত সকলের সামনে। বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে মানুষ তার কাছে ভিড় করতে লাগলো। আল্লাহ তাকে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা দিলেন। সে অন্ধ ও কুষ্ঠরোগে আক্রান্তসহ বহু রোগীর জন্য দোয়া করলে তারা সুস্থ হয়ে উঠতো।

তবে যখন কেউ তার কাছে কোন সমস্যা বা রোগমুক্তির জন্য আসত, তখন সে বলে দিত, “কারো কোন উপকার করা বা রোগমুক্তির ক্ষমতা আমার নেই। সমস্ত ক্ষমতা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের। তবে হ্যাঁ, যদি তোমরা ঈমান আনো, এই সাক্ষী দাও যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তাহলে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করব।” যারা ঈমান আনত, তারা তার দোয়ায় উপকার পেত।

বাদশাহর ঘনিষ্ঠ একজন অন্ধ লোক ছিল। মানুষের মাঝে বালকটির অলৌকিক ক্ষমতার আলোচনা করতে দেখে, অনেক হাদিয়া তোহফা নিয়ে সে তার কাছে এলো। বলল, “তুমি আমাকে আরোগ্য দান করবে। বিনিময়ে এই হাদিয়াগুলো গ্রহণ করো।”

বালক বলল, “আমি কাউকে আরোগ্য দান করি না। যদি তুমি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো, তবে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করব। তিনি তোমাকে আরোগ্য দান করবেন।” সে ঈমান আনল। বালক দোয়া করলো। আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। সে সুস্থ চোখ নিয়ে বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হলো।

রাজদরবারে সত্যের প্রকাশ ও নির্মম পরিণতি

তাকে দেখে বাদশাহ অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, “তোমার দৃষ্টিশক্তি কে ফিরিয়ে দিলো?”

সে উত্তর দিল, “আমার রব।”

বাদশাহ বলল, “আমি? আমি তো এমন কিছু করিনি।”

সে উত্তর দিল, “আমার প্রতিপালকই আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন।”

বাদশাহ্ বলল, “আমি ছাড়াও তোমার প্রতিপালক আছে?”

সে বলল, “আল্লাহই তোমার এবং আমার প্রতিপালক।”

এতে বাদশাহ্ তাকে ধরে শাস্তি দিতে লাগল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগলো। কে তাকে এই শিক্ষা দিয়েছে? কে এই শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র ও সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে? কে রাষ্ট্রীয় আইন পরিপন্থী মতবাদ প্রচার করছে? তার সাথে কে কে আছে? অবশেষে সে বালকটির কথা বলে দিল।

তখন বালকটিকে আনা হল। বাদশাহ তাকে চিনে ফেলল। যেহেতু সে নিজেই বালকটিকে জাদুকরের কাছে সোপর্দ করে দিয়েছিল। তার মনে হয়েছিল, বালকটি সম্ভবত জাদুবিদ্যা রপ্ত করে ফেলেছে। সেটারই প্রকাশ ঘটাচ্ছে মানুষের মাঝে। তার মনে একটা আশা জেগে উঠল। সে জাদুকরের যোগ্য উত্তরসুরী হবে।

তাই বালকের প্রতি তার জিজ্ঞাসাবাদের ধরণটা একটু কোমল ছিল। অত্যন্ত স্নেহপূর্ণ ভাষায় সে বালককে বলল, “হে প্রিয় ছেলে! তোমার যাদুবিদ্যার খবর পৌঁছেছে যে, তুমি নাকি অন্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্য দান করে থাক এবং এটা-সেটা আরও কত কি করে থাক।”

বালকটি সরাসরি তা অস্বীকার করে বলল, “আমি কাউকে আরোগ্য দান করি না। আরোগ্য তো মহান আল্লাহই দান করেন।”

বাদশাহ আর সহ্য করতে পারল না। তাকে ধরে শাস্তি দিতে লাগল। তাওহীদবাদী দায়ীদের তথ্য বের করার জন্য টর্চার শুরু করল। একপর্যায়ে নির্যাতন সইতে না পেরে সে তাওহীদবাদী আল্লাহওয়ালা বুযুর্গের কথা বলে দিল।

তখন বুযুর্গকে আনা হল, তাকে তার দীন থেকে ফিরে আসতে বলা হল। কিন্তু তিনি অস্বীকার করলেন। বাদশাহ এপর্যায়ে কালক্ষেপণ করল না। তখন বাদশাহ করাত আনতে বলল। তারপর করাতটি তার মাথার মাঝখানে রেখে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত চিরে ফেলল। এমনকি তাকে দু’টুকরো করে ফেলা হলো।

তারপর বাদশাহর সেই ঘনিষ্ট ব্যক্তিকে আনা হল। তাকেও তার দীন থেকে ফিরে আসার জন্য বলা হল। সে অস্বীকার করায় তাকেও বুযুর্গের মতো করাত দিয়ে চিরে ফেলা হলো।

ঈমানের চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা

তারপর বালকটিকে আনা হল। তাকেও তার দীন থেকে ফিরে আসতে বলা হল। কিন্তু সে অস্বীকার করল।

বালকের ক্ষেত্রে বাদশাহ অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করল। হয়তো বালককে নিয়ে বাদশাহর পরিকল্পনা ছিল। সে ছিল বাদশাহর জন্য একটি সম্পদতূল্য। তাই কয়েকজন সৈন্যকে ডেকে বলল, “তোমরা তাকে অমুক পাহাড়ে নিয়ে উঠাও। যখন পাহাড়ের উচ্চ শিখরে তাঁকে নিয়ে পৌঁছবে তখন যদি সে তার দীন থেকে ফিরে আসে, তাহলে তাকে নিয়ে আসবে। নইলে তাকে সেখান থেকে ফেলে দাও।”

তারা তাকে নিয়ে গিয়ে পাহাড়ে উঠল। বালক আল্লাহর কাছে দোয়া করল, “হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে চাও এদের হাত থেকে আমাকে মুক্তি দান কর।”

তখন পাহাড়টি কেঁপে উঠল। এতে বালক ছাড়া বাকি সবাই পাহাড় থেকে পড়ে গেল। আর সে বাদশাহের কাছে চলে এল।

বাদশাহ তাকে বলল, “তোমার সংগীদের কি হলো?”

সে বলল, “তাদের ব্যাপারে আমার জন্য মহান আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।”

এবার বাদশাহ তাকে আরেকদল সৈন্যের কাছে দিয়ে বলল, “তাঁকে তোমরা একটি ছোট্ট নৌকায় উঠিয়ে সমুদ্রের মাঝখানে নিয়ে যাও। তারপর সে যদি তাঁর দীন থেকে ফিরে না আসে, তবে তাঁকে সেখানে ফেলে দাও।”

তারা তাঁকে নিয়ে চলল। ছেলেটি দোয়া করল, “হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে চাও তাদের হাত থেকে আমাকে মুক্তি দাও।” এতে নৌকা তাদেরকে নিয়ে ডুবে গেল এবং তারা সবাই ডুবে মরল। আর ছেলেটি বাদশাহের কাছে চলে এল।

বাদশাহ্ তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার সংগীদের কি হলো?”

সে বলল, “মহান আল্লাহই আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করতে যথেষ্ট হয়েছেন।”

এবার বালক ব্যাপারটির একটি নিষ্পত্তি করে ফেলতে চাইল। সে দুনিয়া আখেরাতের বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরেছিল। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ীত্ব তার খোলা চোখে ধরা পড়েছিল। দুনিয়ার জীবন তার কাছে তুচ্ছ ছিল। জান্নাতের চিরস্থায়ী সুখের জন্য সে আকাঙ্ক্ষী ছিল। যেন সে জান্নাতকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল।

আল্লাহকে সে সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবেসেছিল। আল্লাহর দ্বীনকে, আল্লাহর তাওহীদকে সে সবকিছুর উপর প্রাধান্য দিয়েছিল। আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করা, তাওহীদের প্রচারকে সে নিজের মিশন বানিয়ে নিয়েছিল। এর জন্য সে নিজের জান পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত ছিল।

সে জানত দুনিয়া চিরদিন থাকার জায়গা নয়। আজ না হয় কাল, একদিন মরতেই হবে। কিন্তু মৃত্যুটা যেন উদ্দেশ্যপূর্ণ হয়। অর্থপূর্ণ হয়। একটি মৃত্যু যেন হাজারো মানুষের হেদায়াতের কারণ হয়। আমার একজনের মৃত্যুর কারণে যেন হাজারো মানুষ চিরস্থায়ী জাহান্নামের শাস্তি থেকে বেঁচে যায়। সে চাইল, তার মৃত্যু যেন হয় তাওহীদের সাক্ষী।

তাই সে বাদশাহকে বলল, “আপনি আমার হুকুম অনুযায়ী কাজ করলেই আমাকে হত্যা করতে পারবেন।”

বাদশাহ জিজ্ঞেস করল, “সেটা কি কাজ?”

সে বলল, “একটি মাঠে লোকদেরকে একত্রিত করুন। তারপর আমাকে শূলের উপর উঠান এবং আমার তূণীর থেকে একটি তীর নিয়ে ধনুকের মাঝখানে রেখে বলুন, ‘বিসমিল্লাহি রাব্বিল গোলাম’ (বালকটির প্রতিপালক সেই আল্লাহর নামে তীর মারছি)। এই বলে তীর মারুন। তাহলে আপনি আমাকে মারতে পারবেন।”

বাদশাহ চিন্তা করল এই বালক বেঁচে থাকাটা তার জন্য হুমকী স্বরূপ। কারণ সে যতদিন বেঁচে থাকবে মানুষকে বাদশাহর দ্বীন থেকে সরিয়ে নিবে। যত তাড়াতাড়ি তার হাত থেকে নিস্কৃতি পাওয়া যায় ততই মঙ্গল।

তাই বাদশাহ বালকের কথা অনুযায়ী খোলা এক ময়দানে লোকদেরকে একত্রিত করে বালককে শূলের উপর উঠালো। এরপর তার তূণীর থেকে একটি তীর ধনুকের মাঝখানে রেখে, ‘বিসমিল্লাহি রাব্বিল গোলাম’ বলে বালকটির প্রতি তীর নিক্ষেপ করল। তীরটি বালকের কানের কাছে মাথায় লাগল। বালকটি সেখানে তাঁর হাত রাখল। এ অবস্থায় সে মারা গেল।

এই ঘটনা সমবেত লোকদেরকে যেন কাঁপিয়ে দিল। তাদের অন্তরকে যেন প্রচন্ডভাবে ঝাঁকি দিল। তাদের মনে হলো, তারা যেন এতদিন মরিচীকার পিছনে ছুটেছে। আজ তাদের সামনে সত্য উদ্ভাসিত হলো। তারা হেদায়েতের পথ চিনে নিয়েছে। হেদায়েতের শুভ্র আলোকমালা যেন তাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। হঠাৎ করেই ঈমানের আলোয় তাদের অন্তরগুলো আলোকিত হয়ে উঠল। আর তাদেরকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হলো না। সত্যকে আড়াল করে রাখার শয়তানী চক্রান্ত পুরোপুরি ব্যর্থ হলো।

আসহাবে উখদুদ: ইতিহাসের অমর সাক্ষী

সিদ্ধান্ত নিতে তারা বিন্দুমাত্র দেরি করল না। জালিমের চোখরাঙ্গানিকে ভয় পেল না। অত্যাচারির রক্তচক্ষু পুরোপুরি উপেক্ষা করে উচ্চকন্ঠে সাক্ষী দিল, “আমরা বালকটির প্রতিপালক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলাম।”

এ খবর বাদশাহর নিকট গেল, সে দেখল যে আশংকা করছিল তাই বাস্তব হলো। সব লোকেরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল। রাগে দুঃখে বাদশাহ যেন অন্ধ হয়ে গেল। তখন সে রাস্তার পার্শ্বে গর্ত করার হুকুম দিল। গর্ত খনন করে তাতে আগুন জ্বালান হল।

বাদশাহ ঘোষণা দিল, যে ব্যক্তি তার দীন থেকে ফিরে আসবে না তাকে তোমরা এতে ফেলে দেবে। যারা তাদের দীন থেকে ফিরে এল না তাদেরকে আগুনে ফেলে দেয়া হল।

অবশেষে একজন মহিলা তার শিশুসহ এল। সে আগুনের মধ্যে যেতে সংকোচ করতে লাগল। আগুনের ভয়ে ঈমান পরিত্যাগের আশংকা হতে লাগল। এমন অবস্থায় শিশুটি বলল, “হে আম্মা! আপনি সবর করুন (আগুনের মধ্যে যেতে সংকোচ করবেন না)। কারণ আপনি তো সত্যের উপর আছেন।”

মহিলার দ্বিধা কেটে গেল। ঈমানের উপর অটল থাকলেন। হাসিমুখে আগুনের শাস্তি মাথা পেতে নিলেন।

এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে পবিত্র কোরআনের সুরা বুরুজে আল্লাহ বলেছেন,

‘অভিশপ্ত হয়েছিল (অগ্নিকুণ্ডের) অধিপতিরা, ওরা ইন্ধন সংযোগ করে তার (অগ্নিকুণ্ডের) পাশে বসে থাকত এবং বিশ্বাসীদের ওপর তারা যে অত্যাচার করত, তা চেয়ে চেয়ে দেখত। ওরা তাদের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছিল শুধু এই কারণে যে, তারা আল্লাহর উপর বিশ্বাসস্থাপন করেছিল, যিনি পরম শক্তিমান, পরম প্রশংসনীয়, যিনি আকাশ ও পৃথিবীর সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আর আল্লাহ তো সর্ব বিষয়ে স্রষ্টা। যারা বিশ্বাসী নরনারীকে নির্যাতন করেছে ও তারপর তওবা করেনি, তাদের জন্য আছে জাহান্নামের শাস্তি আর দহন যন্ত্রণা।’ (সুরা বুরুজ, আয়াত: ৪-১০)